পৃথিবীর পাখি জগতের অন্যতম রহস্যময় এবং বিরল পাখি হলো মাস্কড ফিনফুট। এর ইংরেজি নাম Masked finfoot(কালোমুখ প্যারা পাখি) এবং নবৈজ্ঞানিক নাম Heliopais personatus। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে এ পাখির দেখা মেলে। দুর্লভতার কারণে অনেকেই এ পাখির নাম শোনেননি। চলুন এই অসাধারণ পাখিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
![]() |
| Masked finfoot (ছবিটি সুন্দরবন থেকে তোলা) |
বাহ্যিক রূপ ও চেহারা
মাস্কড ফিনফুটের গায়ের রঙ ধূসর-বাদামী। এর চোখের চারপাশে কালো মাস্কের মতো চিহ্ন থাকে, যা একে “Masked” অর্থাৎ মাস্ক পরা বা মুখোশ পরা পাখির উপাধি দিয়েছে। এর পা লম্বা ও সবুজাভ-হলুদ রঙের হয়, এবং পায়ের আঙুলগুলোতে ফ্ল্যাপযুক্ত ঝিল্লি থাকে, যা একে সহজে সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৩-৫৫ সেমি হয়।
আবাসস্থল
এরা সাধারণত শান্ত জলাশয়, খাল, নদীর পাড়, জলাভূমি এবং জঙ্গল ঘেরা নদীর ধারে থাকতে পছন্দ করে। ঘন জঙ্গলের আড়ালে থাকা এদের প্রিয়। এজন্য এদের দেখা পাওয়া বেশ কঠিন।
খাদ্যাভ্যাস
মাস্কড ফিনফুট বিভিন্ন জলজ পোকামাকড়, শামুক, মাছ, কেঁচো, এবং ছোট জলজ প্রাণী খেয়ে বাঁচে। এরা পানির উপর ভেসে থেকে কিংবা পানির নিচে শিকার ধরে।
আচরণ
এরা অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের পাখি। কোনো শব্দ বা নড়াচড়া টের পেলে সঙ্গে সঙ্গে গাছের আড়াল বা পানির নিচে লুকিয়ে পড়ে। এদের সাঁতারের দক্ষতা অসাধারণ। পানির উপর খুব সহজে ভেসে থাকতে পারে, আবার প্রয়োজনে ডুব দিয়ে অনেকক্ষণ থাকতে পারে। উড়তে এরা খুব বেশি পছন্দ করে না, সাধারণত আড়াল থেকে আড়ালে ছোট দূরত্বে উড়ে চলে। এদের ডাক খুব বেশি শোনা যায় না, মাঝে মধ্যে কম স্বরে “ক্যাক-ক্যাক” জাতীয় ডাক দিতে শোনা যায়।
প্রজনন
মাস্কড ফিনফুট গাছের ডালে কিংবা জলাশয়ের পাড়ে বাসা বাঁধে। ডিমের সংখ্যা ৪-৭টি পর্যন্ত হতে পারে। এদের প্রজনন সম্পর্কিত তথ্য এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় কারণ এরা খুবই লুকিয়ে চলা পাখি।
সংরক্ষণ অবস্থা
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মাস্কড ফিনফুট বর্তমানে Critically Endangered (অতিশয় বিপন্ন) হিসেবে আইইউসিএন-এর লাল তালিকাভুক্ত। এদের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বন উজাড়, জলাভূমির ধ্বংস, দূষণ এবং শিকার এদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এদের বাঁচাতে বন সংরক্ষণ এবং জলাভূমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে অবস্থান
বাংলাদেশে এ পাখিটি একসময় অনেক বেশি দেখা যেত, বিশেষ করে সুন্দরবন এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে। কিন্তু বর্তমানে এদের দেখা পাওয়া খুবই বিরল। অনেক পাখি প্রেমী এবং পাখি গবেষক মাস্কড ফিনফুটের উপস্থিতি নথিভুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
পাখিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণ
পাখিপ্রেমী, পাখি পর্যবেক্ষক এবং বন্যপ্রাণী গবেষকদের কাছে মাস্কড ফিনফুট এক স্বপ্নের পাখি। অনেকেই বছরের পর বছর চেষ্টা করেন এদের ছবি তুলতে বা পর্যবেক্ষণ করতে। এদের দেখা পাওয়া মানে যেন বিরল কোনো রত্ন খুঁজে পাওয়া। তাই এদের রক্ষায় বিশ্বব্যাপী অনেক সংস্থা এবং পাখি সংরক্ষণ সংগঠন কাজ করছে।
মাস্কড ফিনফুট রক্ষায় আমাদের করণীয়
-
জলাভূমি ও বন সংরক্ষণ করতে হবে।
-
শিকার এবং পাখি পাচার বন্ধ করতে হবে।
-
জনগণকে সচেতন করতে হবে এই বিরল পাখি সম্পর্কে।
-
গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে।
মাস্কড ফিনফুট শুধুই একটি পাখি নয়, বরং আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্যের অংশ এবং প্রকৃতির ভারসাম্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এদের বাঁচাতে সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে।

Comments
Post a Comment